যক্ষা ভাল হয়।

২৪ মার্চ, বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস। সর্বপ্রথম ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস পালনের প্রস্তাব করা হয়। এর অবশ্য একটি কারণও ছিলো। কারণটি হলো ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ ছিলো যক্ষ্মা শনাক্তকারী বিজ্ঞানী রবার্ট কক – এর উদ্ভাবনীর একশত বছর পূর্তি। এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন এগেইনস্ট টিউবারকুলোসিস অ্যান্ড লাং ডিজিজ এই উদ্যোগ গ্রহণ করে। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন এগেইনস্ট টিউবারকুলোসিস অ্যান্ড লাং ডিজিজের সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একাত্মতা ঘোষণা করে। এরপর থেকে সারা বিশ্বে এই দিবসটি যথাযথভাবে পালন হয়ে আসছে।
প্রতিপাদ্য বিষয়:
আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগে শহর, নগর, বন্দর, গ্রামে প্রায় মানুষের মুখে একটি কথা শোনা যেত “যক্ষ্মা হলে রক্ষা নাই”।হ্যা সেই সময় যক্ষ্মা মানেই ছিলো অবধারিত মৃত্যু। তবে সময় অনেকটা পাল্টেছে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে আগের সেই শহর, নগর, বন্দর ও গ্রামের মানুষগুলোর মুখেই শোনা যাচ্ছে “যক্ষ্মা হলে রক্ষা নাই, এই কথার আর ভিত্তি নাই”।হ্যা সময়ের বিবর্তনের সাথে সাথে বিজ্ঞান আবিষ্কার করতে পেরেছে যক্ষ্মা নিরোধক চিকিৎসা। শুধু তাই নয় পাশাপাশি তারা মানুষের মাঝে যক্ষ্মা প্রতিরোধে গণসচেতনতা সৃষ্টির প্রতিও তারা জোর দিয়েছেন। সারা বিশ্বের মানুষকে যক্ষ্মা প্রতিরোধ ও প্রতিকার সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যেই মূলত এই দিবসটি পালন করা হয়।
বিশ্ব যক্ষ্মা দিবসের এই একটি দিনে যদি আমরা যক্ষ্মা প্রতিরোধ বিষয়ে সচেতনতা লাভ করে সারা বছর নিজের মধ্যে ধারণ করতে সক্ষম হই তাহলে এই ভয়াবহ এই রোগ আমাদের স্পর্শ করতে পারবে না।
যক্ষ্মা কি?
যক্ষা একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ যা প্রাথমিকভাবে ফুসফুসকে আক্রান্ত করে। মাইক্রোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস নামক এক ধরণের জীবাণুর সংক্রমণের মাধ্যমে যক্ষা হয়।যক্ষ্মা যক্ষা দুই ধরণের হয় :
সুপ্ত বা Latcut TB: এক্ষেত্রে যক্ষার সংক্রমণ হলেও জীবাণুগুলো সক্রিয় থাকে না এবং সমস্যার কোন লক্ষণ দেখা যায় না।
সক্রিয় বা Active TB: এক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং তার থেকে অন্যরাও আক্রান্ত হতে পারে।
আসুন প্রথমে আমরা এই রোগের প্রতিরোধ সম্পর্কে জানি:
জন্মের পর পর প্রত্যেক শিশুকে বিসিজি টিকা দেয়া
হাঁচি-কাশি দেয়ার সময় রুমাল ব্যবহার করা
যেখানে সেখানে থুথু না ফেলা
রোগীর কফ থুথু নির্দিষ্ট পাত্রে ফেলে তা মাটিতে পুঁতে ফেলা
যাদের যক্ষ্মা হতে পারে:
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যাদের কম
যক্ষায় সংক্রমিত ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা ব্যক্তি
বয়স্ক ব্যক্তি
অপুষ্টি
যারা সুষম খাদ্য গ্রহণ করেন না
যারা দীর্ঘদিন ধরে মাদক সেবন করছেন
এই রোগে যে ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে:
ফুসফুসের ক্ষতি
অস্থিসন্ধি ব্যথা, ক্ষয়
মেনিনজাইটিস (মস্তিষ্ক এবং স্নায়ু সংক্রমিত হলে)
মিলিয়ারি টিবি (Miliary TB) (সমস্ত শরীরে সংক্রমিত হলে )
যক্ষা রোগের জীবাণু যেভাবে ছড়ায়:
বাতাসের মাধ্যমে যক্ষা রোগের জীবাণু ছড়ায়। যক্ষা রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে রোগের জীবাণু বাতাসে গিয়ে মিশে এবং রোগের সংক্রমণ ঘটায়।
লক্ষণ:
কাশি, মাঝে মধ্যে রক্ত সহ শ্লেষ্মার নির্গমন
বুকে ব্যথা
হালকা জ্বর
ওজন কমে যাওয়া এবং অবসাদ
রাতের বেলায় ঘামানো
কাপুনী
ক্ষুধা মন্দা
চিকিৎসা
যক্ষার লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা দেয়ার সাথে সাথে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করতে হবে এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু করতে হবে। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে বিনামূল্যে যক্ষ্মার চিকিৎসা করা হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
জেলা সদর হাসপাতাল
বক্ষব্যাধি ক্লিনিক/হাসপাতাল, নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র
এনজিও ক্লিনিক ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সমূহে বিনামূল্যে কফ পরীক্ষা, রোগ নির্ণয়সহ যক্ষার চিকিৎসা করা হয় ও ঔষধ দেয়া হয়।
যে সকল টেস্ট করাতে হয়:
ত্বকের পরীক্ষা
রক্তের পরীক্ষা
কফ পরীক্ষা
বুকের এক্স-রে পরীক্ষা অথবা সিটি স্ক্যান
কালচার টেস্ট
পরীক্ষার ফল নেতিবাচক হলেও অনেক সময় যক্ষার সংক্রমণ হতে পারে। যেমন:
যক্ষার সংক্রমণের ৮-১০ সপ্তাহ পরে তা ত্বকের পরীক্ষায় ধরা পড়ে। তার আগে পরীক্ষা করলে ধরা নাও পড়তে পারে
এইডস এর মতো কোন রোগের কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে অনেকসময় পরীক্ষায় যক্ষা রোগ ধরা পড়ে না। এছাড়া এইডস এবং যক্ষা রোগের লক্ষণ ও উপসর্গ গুলো প্রায় এক রকম হওয়ায় এইডস রোগীদের যক্ষা রোগ নির্ণয়ের বিষয়টি জটিল হয়ে থাকে।
হামের টিকা নিলে এগুলোতে অনেক সময় জীবন্ত জীবাণু (Live virus) থাকে, এর জন্য ত্বক পরীক্ষায় যক্ষা ধরা নাও পড়তে পারে।
শরীরে যক্ষা রোগের জীবাণু বেশী মাত্রায় ছেয়ে গেলে (Overwheliming TB disease) ত্বকের পরীক্ষায় রোগের জীবাণু ধরা নাও পড়তে পারে
অনেক সময় সঠিকভাবে পরীক্ষা না করলেও এতে যক্ষা রোগের জীবাণু ধরা পড়ে না।
কি ধরণের চিকিৎসা আছে
ডটস পদ্ধতিতে অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদী, সরাসরি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যক্ষা রোগের চিকিৎসা করা হয়। এজন্য ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী রোগের ধরণ, মাত্রা এবং রুগীর বয়স অনুসারে ঔষধের কোর্স সম্পূর্ণ করতে হবে। যক্ষার চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে:
এন্টিবায়োটিক সেবন। সাধারণত ৬-৯ মাস ব্যাপী এন্টিবায়োটিক ঔষধ সেবন করতে হবে
শিশুদের ক্ষেত্রে Streptomycin সেবন
গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে Isoniazid Rifampin, এবং Ethambutol সেবন
অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের ফলে যে সকল অসুবিধা দেখা দিতে পারে:
বমি বমি ভাব অথবা বমি
ক্ষুধামন্দা
ত্বক হলদে হয়ে যাওয়া
গাঢ় রঙয়ের প্রস্রাব
কোন কারণ ছাড়াই তিন দিনের অধিক জ্বর থাকা
পেট যন্ত্রণা
চোখে অস্পষ্ট দেখা
যক্ষ্মার ঔষধসমূহ:
প্রথম সারির ঔষধ দ্বিতীয় সারির ঔষধ
রিফাম্পিসিন
আইসোনিয়াজিড
পাইরাজিনামাইড
ইথামব্যুটল
স্ট্রেপ্টোমাইসিন ওফ্লক্সাসিন
রিফাবিউটিন
ইথিওনামাইড
সাইক্লোসেরিন
প্যারা অ্যামিনো স্যালিসিলেট