ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে করনীয়ঃ জানা ও অজানা
“রোগ বালাইতো আছে দুনিয়ায়, ভাল থাকার আছে যে উপায়।”
জীবন থাকলে রোগ থাকবে, আর রোগ থেকে
বেঁচে থাকার উপায় জানা থাকলে রোগ প্রতিরোধ করা খুব
কঠিন নয়। কোন কোন রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসার
চেয়ে প্রতিরোধ অনেক সহজ। যেমন ডায়াবেটিস
রোগ।
বর্তমান বিশ্বে যে রোগগুলো জনস্বাস্থ্যের জন্য
হুমকী হয়ে দাঁড়িয়েছে তার মধ্যে ডায়াবেটিস অন্যতম।
ডায়াবেটিস নিঃসন্দেহে একটি মারাত্মক রোগ। এটি কোনও
জীবাণু ঘটিত রোগ বা ছোঁয়াচে রোগ নয়। শরীরে
প্রয়োজনীয় ইনসুলিনের অভাবে অথবা ইনসুলিনের
কার্যকারীতা হ্রাস পাওয়ার কারণে এই রোগ দেখা দেয়।
অতিরিক্ত মোটা ব্যক্তি যারা অধিক খাদ্য গ্রহণ করেন এবং যারা
কায়িক পরিশ্রম করেন না বা কম করেন তাদের এই রোগ হবার
সম্ভাবনা বেশী। শুধু মোটা নয় হাল্কা-পাতলা ব্যক্তিরও
ডায়াবেটিস রোগ হতে পারে। কোনও কোনও
ক্ষেত্রে পূর্বপূরুষের এই রোগ থাকলে কোনও ব্যক্তির
ডায়াবেটিস রোগ হতে পারে। গর্ভকালীন সময়েও এই
রোগ দেখা দিতে পারে। এছাড়া বিভিন্ন জটিল রোগের
কারণেও ডায়াবেটিস হতে পারে। ডায়াবেটিস কোনও নিরাময়
যোগ্য রোগ নয়, এটি শুধুমাত্র নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
আমাদের শরীরে অগ্নাশয় বা প্যানক্রিয়াস নামের একটি অঙ্গ
থাকে। এই অঙ্গের প্রান্তীয় অংশে বিটা সেল নামের কিছু
কোষ থাকে। এই বিটা সেল থেকে ইনসুলিন হরমোন
তৈরী হয়। অর্থাৎ শরীরের প্রয়োজনীয় ইনসুলিন
আমাদের শরীরের ভেতরেই উৎপন্ন হয়। ধরা হয়ে
থাকে যে, একজন স্বাভাবিক ওজনের মানুষের শরীরে প্রতি
ঘন্টায় ১ ইউনিট করে ২৪ ঘন্টায় ২৪ ইউনিট ইনসুলিন উৎপাদন হয়
এবং দৈনিক ৩ বেলা খাদ্য গ্রহণের পর প্রতিবেলা গড়ে ৮ ইউনিট
করে ২৪ ইউনিট সহ মোট ৪৮ ইউনিট ইনসুলিন উৎপাদন হয়।
ইনসুলিনের কাজ হল রক্তের গ্লুকোজকে শরীরের
বিভিন্ন কোষে পৌঁছে দেওয়া। ইনসুলিনের উৎপাদন কমে
গেলে অথবা এর কার্যকারীতা হ্রাস পেলে রক্তে
গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায় এবং কোষের ভিতরের
গ্লুকোজের পরিমান কমে যায়।
আগে বলা হত কোন ব্যক্তির বার বার প্রশ্রাব হলে সে
ডায়াবেটিস বা বহুমুত্র রোগে আক্রান্ত। কিন্তু গবেষণায়
দেখা গেছে বার বার প্রশ্রাব হলেই ডায়াবেটিস না বরং বিভিন্ন
উপসর্গ পর্যালচনা করে এবং রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা
পরীক্ষা করেই কেবল ডায়াবেটিস রোগ শনাক্ত করা যায়।
খালি পেটে রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা ৭ মিলিমোল/লিটার
(প্রায় ১২৫ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার) বা তার বেশী হলে অথবা ৭৫
গ্রাম গ্লুকোজ খাওয়ার ২ ঘণ্টা পরে রক্তের গ্লুকোজের
মাত্রা ১১.১ মিলিমোল/লিটার (প্রায় ২০০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার) বা
তার বেশী হলে ডায়াবেটিস হয়েছে বলে ধরে নিতে
হবে।
ডায়াবেটিস মূলতঃ দুই ধরনের – (১) টাইপ ১ ডায়াবেটিস মেলাইটাস
(২) টাইপ ২ ডায়াবেটিস মেলাইটাস। টাইপ ১ ডায়াবেটিস
মেলাইটাসের অন্য নাম হচ্ছে ইনসুলিন ডিপেনডেন্ট
ডায়াবেটিস মেলাইটাস (IDDM) বা জুভেনাইল অনসেট
ডায়াবেটিস মেলাইটাস, এটি প্যানক্রিয়াসের বিটা সেল থেকে
ইনসুলিন উৎপাদন কম বা না হলে অথবা উৎপাদিত ইনসুলিন রক্তে
পরিবাহিত হতে না পারলে দেখা দেয়। এটি স্বল্পতম সময়ে
শুরু হতে পারে। টাইপ ২ ডায়াবেটিস মেলাইটাসের অন্য নাম
হচ্ছে নন ইনসুলিন ডিপেনডেন্ট ডায়াবেটিস মেলাইটাস
(NIDDM) বা লেইট অনসেট ডায়াবেটিস মেলাইটাস, এটি
শরীরের উৎপাদিত ইনসুলিন ঠিকমত কাজ না করলে অথবা
উৎপাদন অনুপাতে রোগীর শরীরের ওজন বেশী
হলে দেখা দেয়। এটি ধীরে ধীরে অনেক বছর সময়
নিয়ে দেখা দেয়।
টাইপ ১ ডায়াবেটিস এর রোগীরা ইনসুলিন ইঞ্জেকশন ছাড়া
বেঁচে থাকতে পারেন না, টাইপ ২ ডায়াবেটিস এর রোগীরা
পরিমিত খাদ্য গ্রহণ, সঠিক নিয়মে ব্যায়াম এবং প্রয়োজনে কিছু
ঔষধ সেবন করে বছরের পর বছর সুস্থ্য দেহে বেঁচে
থাকতে পারেন। টাইপ ১ ডায়াবেটিস সাধারণত শিশুদের এবং ৩০
বছরের নীচের ব্যক্তিদের হয়ে থাকে এবং টাইপ ২
ডায়াবেটিস সাধারণত ৩০ বছরের বেশী বয়সের
ব্যক্তিদের হয়ে থাকে, তবে কম বয়সেও টাইপ ২
ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এছাড়াও আরও ২ ধরণের ডায়াবেটিস আছে, তা হল (ক)
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (GDM) এবং (খ) অন্যান্য রোগ ও ঔষধ
ভিত্তিক ডায়াবেটিস (Other Specific Type)।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস সাধারণত সন্তান জন্মদানের পর
সেরে যায়। কিন্তু পরবর্তিতে মায়ের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত
হওয়ার সম্ভাবনা অনেকগুণ বেড়ে যায়। অন্যান্য রোগ ও ঔষধ
ভিত্তিক ডায়াবেটিস (Other Specific Type) হল হরমোন ও
প্যানক্রিয়াসের কিছু রোগ বা কোন কোন ঔষধের (যেমনঃ
স্টেরয়েড) ফলে সৃষ্ট ডায়াবেটিস।
ডায়াবেটিস রোগীদের ব্রেইন স্ট্রোকের সম্ভাবনা
সাধারণ ব্যক্তির তুলনায় ৬ গুন বেশী। এছাড়াও ডায়াবেটিস
রোগীর হৃদরোগ, কিডনীর রোগ, চোখের রোগ
ও পা কেটে ফেলার সম্ভাবনা অন্য রোগীর তুলনায়
যথাক্রমে ২-৩ গুন, ৫ গুন, ২৫ গুন ও ২০ গুন বেশী। সুতরাং
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করার কোন বিকল্প নেই। আসুন আমরা
ডায়াবেটিসের হাত থেকে বাঁচার কি কি উপায় আছে তা জেনে
নিই।
ডায়াবেটিস কাদের হতে পারেঃ বয়স ৩০ এর উপর, যাদের
উচ্চতার অনুপাতে ওজন বেশী, যাদের মেদ-ভুঁড়ি অতিরিক্ত,
যারা কায়িক পরিশ্রম করেন না বা কম করেন, খাদ্য গ্রহণের মাত্রা
যাদের বেশী, বংশগত কারন, কোন কোন দুরারোগ্য
ব্যধী যেমন থাইরয়েডের রোগ, প্যানক্রিয়াসের রোগ
ইত্যাদি, কোন কোন স্টেরয়েড জাতীয় ঔষধের
কারণে, অধিক সন্তান জন্মদানকারী মা (সিজারে বা স্বাভাবিক উভয়
ক্ষেত্রেই), যাদের এক বা একাধিক মেজর অপারেশন
হয়েছে, যারা মাত্রাতিরিক্ত ধূমপান বা এলকোহল পান করেন,
যাদের পেটের বেড়ের মাপ নিতম্বের বেড়ের মাপের
চেয়ে বেশী, যাদের রক্তের কোলেস্টেরল
(ট্রাইগ্লিসারাইড) অনেক বেশী, দুশ্চিন্তাগ্রস্থ ব্যক্তি, অপুষ্টি
জনিত কারণ ইত্যাদি। এইসব ক্ষেত্রে বছরে অন্ততঃ দুইবার
রক্তের গ্লুকোজ পরিমাপ করা উচিৎ।
প্রতিরোধের উপায়ঃ
যাদের এখনো ডায়াবেটিস রোগ হয়নি কিন্তু হওয়ার সম্ভাবনা
আছেঃ ফাস্ট ফুড জাতীয় খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন।
যথাসম্ভব ঘরে তৈরী খাদ্য গ্রহণের চেষ্টা করুন। ঘরে
তৈরী খাদ্যে অতিরিক্ত তেল-চর্বি বাদ দিতে হবে। যেমনঃ
তেলের/ঘিয়ের পরোটার পরিবর্তে শুকনা আটার রুটি
খেতে হবে, গরু-খাসীর মাংশ রান্নার আগে সব চর্বি
ফেলে দিতে হবে, মুরগীর তৈলাক্ত চামড়া খাওয়া যাবেনা,
তৈলাক্ত ও চর্বিযুক্ত মাছ বর্জন করতে হবে। অনেকের ধারনা
মিষ্টি বেশী খেলে ডায়াবেটিস হয়, এটা সঠিক না। মিষ্টান্ন
দ্রব্য, ভাত, রুটি, পিঠা, মুড়ি, চিড়া, খই, ভুট্টা, আলু, জ্যাম, জেলী,
মার্মালেড, কোমল পানীয়, এনার্জি ড্রিংক এগুলো সবই হল
কার্বহাইড্রেট বা শর্করা জাতীয় খাদ্য। এদের সবগুলোর মূল
উপাদানই গ্লুকোজ, যা রক্তের গ্লুকোজ বাড়ায়। কিন্তু পরিমিত
ভাবে গ্রহণ করলে এগুলো ডায়াবেটিসের কারণ হবে না।
আমরা সাধারনতঃ সকালে হালকা নাস্তা করি, দুপুরে আর রাতে পেট
ভরে খাই। একসাথে বেশী না খেয়ে পেট কিছু খালি
রেখে উঠতে হবে। তিন বেলার খাবারকে ভাগ করে যদি ৫
বারে খাই তাহলে উপকার পাওয়া যাবে অর্থাৎ (১) সকালের নাস্তা
(২) সকাল ও দুপুরের খাবারের মাঝামাঝি সময়ে কিছু খাওয়া (৩)
দুপুরের খাবার (৪) দুপুর ও রাতের খাবারের মাঝামাঝি বিকালে কিছু
খাওয়া এবং (৫) রাতের খাবার।
দৈনিক দুই বেলা আধা ঘন্টা করে দ্রুত হাঁটার অভ্যাস করতে
হবে। খালি পেটে এবং খালি পায়ে হাঁটবেন না। হাঁটার গতি হতে
হবে দ্রুত, যাতে শরীর থেকে ঘাম ঝরে। অতিরিক্ত ও
অসময়ের ঘুম ত্যাগ করতে হবে। মোটকথা উচ্চতা অনুযায়ী
আপনার ওজন যতটুকু হওয়া উচিৎ তার থেকে বেশী মেদ-
ভুঁড়ি বা ওজন থাকলে তা কমিয়ে সমান করতে হবে।
ধূমপান, মদ্যপান বা সাদাপাতা-জর্দা দিয়ে পান খাওয়ার অভ্যাস থাকলে
তা ত্যাগ করতে হবে।
কোন ব্যক্তির উচ্চতা অনুযায়ী আদর্শ শারীরিক ওজন (Ideal
Body Weight) কতটুকু হওয়া উচিৎ তা সাধারণভাবে বের করার নিয়ম
হলঃ আপনার উচ্চতা যত সেন্টিমিটার, তা থেকে ১০০ বিয়োগ
দিন। মনে করুন আপনার উচ্চতা ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি, অর্থাৎ ৬৬ ইঞ্চি।
একে সেন্টিমিটারে নিতে হলে ২.৫৪ দিয়ে গুন করলে পাওয়া
যাবে ১৬৭ সেন্টিমিটার (প্রায়)। এখন ১৬৭ থেকে ১০০ বাদ
দিলে থাকে ৬৭। অর্থাৎ ৬৭ কেজি। এটিই হল ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি
উচ্চতার একজন মানুষের আদর্শ শারীরিক ওজন।
যাদের ডায়াবেটিস রোগ হয়ে গেছেঃ ডায়াবেটিস হলেই
ভয়ের কিছু নেই যদি তা নিয়ন্ত্রণে থাকে। পরিমিত খাদ্য গ্রহণ,
কায়িক পরিশ্রম যেমন দৈনন্দিন কাজ-কর্ম, নিয়মানুযায়ী হাঁটা ও
ব্যায়াম করা, উচ্চতা অনুযায়ী শরীরের ওজন সঠিক রাখা ইত্যাদি
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে কার্যকর ভুমিকা রাখবে।
এরপরেও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে চিকিৎসকের
পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ সেবন বা ইনসুলিন ইঞ্জেকশন নিতে
হবে। অনেকের ভূল ধারণা আছে যে, একবার ইনসুলিন
ইঞ্জেকশন নিলে পরবর্তিতে আর খাওয়ার ঔষধে কাজ
করবে না। এটি ভূল ধারণা। অনেকেরই প্রথমবার ডায়াবেটিস
রোগ ধরা পরে অন্য কোন রোগের চিকিৎসার জন্য
পরীক্ষা করাতে গিয়ে বা অপারেশনের জন্য পরীক্ষা
করাতে গিয়ে। সেই ক্ষেত্রে কারও কারও রক্তে খুব
বেশী গ্লুকোজ ধরা পরলে তখন ইনসুলিন ইঞ্জেকশন
দিয়ে চিকিৎসা শুরু করলে দ্রুত ফল পাওয়া যায়, যা কিনা পরবর্তিতে
খাওয়ার ঔষধের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। তবে
মনে রাখতে হবে, ইনসুলিন ইঞ্জেকশনই ডায়াবেটিস
রোগের চিকিৎসার জন্য সবচেয়ে ভালো ঔষধ।
যদি কারও প্রথমবারের মত ডায়াবেটিস ধরা পরে এবং তা অনেক
বেশী হয় তাহলে তার উচিৎ হাসপাতালে ভর্তি হয়ে
ইনসুলিনের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা।
ডায়াবেটিস রোগীর যে কোন ক্ষত সাধারণতঃ
দেরীতে শুকায়। তাই সতর্ক থাকতে হবে যেন
শরীরে কোন ক্ষত না হয়। সবচেয়ে বেশী মারাত্মক
হয় পায়ের ক্ষত। হাত-পায়ের নখ কাটার সময় ব্লেডের
পরিবর্তে নেইল কাটার ব্যবহার করুন, নখের কোনা গভীর
করে কাটবেন না। নখ কাটুন গোসল করার পর, কেননা,
গোসলের পর হাত-পায়ের নখ বেশ নরম থাকে এবং কাটতে
সুবিধা হয়। জুতা কিনবেন বিকালে বা সন্ধ্যায়, কারণ দেখা গেছে
এসময় পায়ের মাপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে। পায়ের মাপের
চেয়ে এক সাইজ বড় জুতা কিনতে হবে ও মোটা সুতি বা
উলেন মোজা পড়তে হবে। সেন্ডেলের চেয়ে জুতা
বা সু ভালো। জুতা পড়ার সময় জুতার ভিতর ঝেড়ে নিতে হবে
যেন ভিতরে কোন ইট, লোহা বা কোন কিছুর টুকরা না
থাকে। গরম পানি ব্যবহার করার সময় নিজে না দেখে
ডায়াবেটিসমুক্ত অন্য কাউকে দিয়ে দেখতে হবে পানি
বেশী গরম কিনা।
ধুমপান, মদ্যপান বা সাদাপাতা-জর্দা দিয়ে পান খাওয়ার অভ্যাস থাকলে
তা চিরতরে পরিত্যাগ করতে হবে।
যাদের ডায়াবেটিস রোগ পুরাতন এবং ডায়াবেটিস জনিত জটিলতা
শুরু হয়েছেঃ ডায়াবেটিস রোগ ধরা পড়ার পর থেকেই কেউ
যদি এটি প্রতিদিন প্রতিবেলা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে রাখতে
পারেন তাহলে ডায়াবেটিস জনিত জটিলতা সহজে দেখা
দেবে না। কিন্তু বেশীর ভাগ রোগীরাই এই রোগটি
সম্পর্কে কম জানার কারণে বা একটু ভালো বোধ করলে বা
বিভিন্ন অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার কারণে বা ধূমপান বন্ধ না করার ফলে বা
খাদ্য ও ওজন নিয়ন্ত্রণ না করার ফলে এক সময় বিভিন্ন জটিল
রোগে আক্রান্ত হন। আমি আগেই বলেছি ডায়াবেটিস
রোগীদের ব্রেইন স্ট্রোক, হৃদরোগ, কিডনীর
রোগ, চোখের রোগ ও পা কেটে ফেলার সম্ভাবনা
অন্য রোগীর তুলনায় যথাক্রমে ৬ গুন, ২-৩ গুন, ৫ গুন, ২৫
গুন ও ২০ গুন বেশী। সুতরাং এই সব জটিলতা দেখা দিলে সাথে
সাথে উপযুক্ত চিকিৎসা শুরু করতে হবে।
যারা ইনসুলিন ইনজেকশন নেন তারা সব সময় নিয়ম মতো
ইনজেকশন নিবেন। সবচেয়ে ভালো হয় যদি গ্লুকোমিটার
দিয়ে পরীক্ষা করে ইনসুলিন নেন। আর যারা ডায়াবেটিসের
ঔষধ খান তারা নিয়মিত ঔষধ খেতে ভুলবেন না। এসবের
পাশাপাশি খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মমতো হাঁটার অভ্যাস বজায় রাখুন।
ডায়াবেটিসের মুখে খাওয়ার ঔষধ অনেক ধরনের আছে।
কোন কোন রোগীর ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন মুখে
খাওয়ার ঔষধ কাজ করে। আবার কোন কোন রোগীর
ক্ষেত্রে মুখে খাওয়ার ঔষধ বেশীদিন কাজ করে না অথবা
প্রথম থেকেই অকার্যকর হয়ে যায়। সেসব ক্ষেত্রে
রোগীর উচিৎ দেরী না করে ইনসুলিন ইনজেকশন শুরু
করা।
ইনসুলিন শুরু করলে ডোজ নির্ধারনের জন্য কিছুদিন সময়
লাগে। ডোজ কম হলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ হতে চায় না।
সেক্ষেত্রে ডোজ বাড়িয়ে এবং গ্লুকোজ পরীক্ষা
করে ইনসুলিনের সঠিক মাত্রা নির্ধারন করতে হবে।
ডায়াবেটিস বা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা খুব বেড়ে
গেলে রোগী অজ্ঞান হয়ে কোমায় (কিটো-
এসিডোসিস বা হাইপার অসমোলার নন কিটোটিক কোমা)
চলে যেতে পারে। এই ক্ষেত্রে রোগীকে দ্রুত
নিকটস্থ হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। আবার ডোজ
বেশী হয়ে গেলে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা ডায়াবেটিস
নিল হয়ে রোগী অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে।
হাইপোগ্লাইসেমিয়া দেখা দিলে অতি দ্রুত রোগীকে
ফলের জুস অথবা চিনির পানি খাওয়াতে হবে। এতেও রোগী
স্বাভাবিক না হলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে ভর্তি করতে
হবে। ডায়াবেটিস রোগীর উচিৎ বাসায় গ্লুকোমিটার রাখা এবং
এটি ব্যবহার করতে জানা। অনেকে গ্লুকোমিটারে রক্ত
পরীক্ষা করতে পারেন কিন্তু মিটার আর স্ট্রিপের কোডে
মিল আছে কিনা যাচাই করেন না। গ্লুকোমিটারে ডায়াবেটিস
পরীক্ষা করার সময় মিটার ও স্ট্রিপের কোড দেখে মিলিয়ে
নিবেন না হলে ভুল ফলাফল আসবে এবং যে আঙ্গুল থেকে
রক্ত নিবেন সেটি এলকোহল প্যাড বা হেক্সিসল সল্যুশন
দিয়ে ভালোভাবে মুছে শুকিয়ে নিবেন। না হলে
ক্ষতস্থানে ইনফেকশন হতে পারে।
ডীপ ফ্রিজে ইনসুলিন রাখবেন না। এতে ইনসুলিনের
কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যাবে। ১০০ ইউনিট লেখা ভায়াল হলে ১০০
ইউনিট লেখা সিরিঞ্জ (কালো রঙ্গের দাগ কাটা) এবং ৪০ ইউনিট
লেখা ভায়াল হলে ৪০ ইউনিট লেখা সিরিঞ্জ (লাল রঙ্গের দাগ
কাটা) ব্যবহার করতে হবে, এক্ষেত্রে ভুল করা চলবে না।
শরীরের নির্দিষ্ট জায়গা ব্যতীত অন্য কোথাও ইনসুলিন
দিবেন না।
একটা কথা না বললেই নয়, তা হল ডায়াবেটিক রোগীদের
ব্যথার অনুভুতি কম থাকার কারণে ইনসুলিন ইনজেকশন দিতে
ব্যথা হয় না বললেই চলে। এছাড়াও বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন
ধরনের ইনসুলিন ডিভাইস পাওয়া যায়, এগুলো ব্যবহার করা
সুবিধাজনক এবং এর সুই একদম চিকন।
রোজার সময় বা অসুস্থতার সময় (যেমনঃ জ্বর, ডায়রিয়া, বমি)
খাওয়ার ঔষধ বা ইনসুলিনের মাত্রা পুনঃনির্ধারণ প্রয়োজন হয়।
সেক্ষেত্রে আপনার ডায়াবেটিস চিকিৎসকের সাথে
রোজার আগেই পরামর্শ করে নিতে ভুলবেন না।
ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রেঃ বাচ্চার মায়ের ভূমিকাই প্রধান।
দৈনিক একাধিকবার ইনসুলিন দেওয়ার জন্য মাকে প্রশিক্ষণ দিতে
হবে।
স্কুলের বাচ্চাদের জন্য স্কুলের শিক্ষকদের
কয়েকজনকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। যে সব বাচ্চার
ডায়াবেটিস আছে তাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে।
তারা যেন টিফিন ঠিকমতো খায় এবং প্রয়োজনে ক্লাস
চলাকালীন সময়মত ইনসুলিন নেয় সেই দিকে লক্ষ্য রাখতে
হবে। একটু বড় বাচ্চাদের ক্ষেত্রে যারা নিজেরাই ইনসুলিন
নিতে পারবে তাদেরকে ইনসুলিন নেওয়ার প্রশিক্ষণ দিতে
হবে।